পথ হারিয়ে জামালপুর চলে যাওয়া গাজীপুরের দুই কিশোরী সানজিদা ও আতিয়া অবশেষে তাদের নিজ বাড়িতে গত মঙ্গলবার (২ জুন) ফিরে এসেছে। ওই দুই কিশোরী গত শনিবার অজানার উদ্দেশ্যে বের হয়ে দূর জেলা জামালপুর চলে যায়। গাজীপুরের শ্রীপুরের পূর্ব নিজ মাওনা গ্রামের সোহেল রানার মেয়ে ওরা। চৌদ্দ বছরের সানজিদা আর তেরো বছরের আতিয়া। পিঠাপিঠি দুই বোন এক নিমেষে উধাও। কোনো পারিবারিক অশান্তি নয়, নিখোঁজ হওয়ার পেছনে কাজ করেছে ভার্চুয়াল দুনিয়ার এক ভয়ঙ্কর মায়াজাল। এক টিকটকারের রঙিন প্রলোভনে পা দিয়ে, সামান্য অভিমানে নিজেদের চেনা ঘর ছেড়ে অজানা-অচেনা পথের উদ্দেশ্যে পা বাড়িয়েছিল তারা। তারা ভেবেছিল পর্দার ওপারের জগৎটা বুঝি আরও বেশি সুন্দর। কিন্তু কিছুদূর যেতেই সেই মায়াজাল কেটে যায়, চারপাশের চেনা দুনিয়াটা বদলে যায় এক চিলতে আতঙ্কে। পথ ভুলে দিকবিদিকশূন্য হয়ে পড়ে তারা।নিশ্চিত কোনো বড় বিপদের মুখে পড়ার আগেই এই দুই বোনের জীবনে আলো হয়ে আসেন একজন জাহাঙ্গীর আলম । মেয়ে দুটির অসহায়ত্ব দেখে তিনি জামালপুর থেকে ফেসবুকে একটি মানবিক পোস্ট দেন, যেখানে তিনি জানান: "পথ ভুলে চলে আসা এই মেয়ে দুটিকে আমরা পেয়েছি... তারা দুই বোন। ছোট বোন শ্রীপুরের পূর্ব নিজমাওনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ালেখা করে এবং বড় বোন গাজীপুর উচ্চবিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত। কোনো কারণে তারা কারো মোবাইল নম্বর বলছে না অথবা মনে করতে পারছে না। মেয়ে দুটি এখন জামালপুর অপরাজেয় বাংলাদেশের সেল্টার হোমে আছে...পোস্টটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে তা নজরে আসে জামালপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ ইউসুফের। তিনি কালক্ষেপণ না করে দ্রুত যোগাযোগ করেন গাজীপুরের জেলা প্রশাসক নূরুল করিম ভূঁইয়ার সাথে। ঘরের মেয়েদের ঘরে ফেরাতে এরপর শুরু হয় এক যৌথ ও দ্রুতগতির প্রশাসনিক তৎপরতা। গাজীপুরের ডিসি তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়ার জন্য শ্রীপুরের উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) কে নির্দেশ দেন। ইউএনও দ্রুততার সাথে মাঠে নেমে স্থানীয় ফরাজিপাড়া ও বিএনপি বাজার সংলগ্ন পূর্ব নিজ মাওনা গ্রাম থেকে মেয়ে দুটির নাম-ঠিকানা নিশ্চিত করেন এবং তাদের পিতা-মাতাকে ডেকে এনে বিষয়টি জানান। মঙ্গলবার । ২ জুন । নিখোঁজ হওয়ার ঠিক দুই দিন পর, উভয় জেলা প্রশাসকের হস্তক্ষেপে ও বিশেষ ব্যবস্থাপনায় সানজিদা ও আতিয়াকে তাদের মা-বাবার কাছে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে। জামালপুরের ‘অপরাজেয় বাংলাদেশ’ সেল্টার হোম থেকে বিশেষ সুরক্ষায় এনে তাদের মা-বাবার কোলে তুলে দেওয়া হয়।গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মোঃ নূরুল করিম ভূঁইয়া স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলেন, "আল্লাহর অশেষ মেহেরবানী, এ দুই অভিমানী মেয়ের কোনো সমস্যা হয়নি। অপরাজেয় বাংলা শেল্টার হোমের শেল্টারে তারা নিরাপদ ছিল এবং বেশিদূর পথহারা হতে হয়নি। তবে শুধু ফিরিয়ে দিয়েই প্রশাসন তাদের দায়িত্ব শেষ করেনি। এই দরিদ্র পরিবারের মেয়ে দুটির পড়াশোনা যাতে অর্থের অভাবে বন্ধ না হয়, সেজন্য শ্রীপুরের ইউএনও-কে এই দুই কন্যার পড়াশোনার যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার নির্দেশনা প্রদান করেছেন গাজীপুর জেলা প্রশাসক ।ঘটনার শুরু ও শেষ শুনে এলাকার লোকজন বলছেন, নিরাপদে ফিরে আসা ওই দুই কিশোরীর জীবনটা অন্য রকম হতে পারতো। প্রশাসনের মানবিকতা ও আন্তরিকতাকে তারা প্রশংসা করেন ও জেলা প্রশাসককে কৃতজ্ঞতা জানান তারা।