বকশীগঞ্জ উপজেলার চিরসবুজ একটি গ্রাম। এই মেরুর চর গ্রামেই জন্ম নিয়েছিলেন খাইরুন নাহার ওরফে খায়রুন সুন্দরী। শহর থেকে একটু দূরে অবস্থিত এই মেরুর চর জনপদটি দেশে-বিদেশে সিনেমা প্রেমী সকলের কাছে পরিচিত। যে জামালপুর জেলায়। খাইরুন সুন্দরীর জন্ম এই গ্রামে- এই সুবাদে মেরুর চরের পরিচিতিটাও ছড়িয়ে পড়েছে সবখানে। খায়রুন সুন্দরী সিনেমায় খাইরুন ও তার স্বামী দেওয়ানগঞ্জের ফজলের রসালো প্রেম কাহিনী নিয়ে তৈরি করা হয়েছে এই সিনেমা। আগ্রহ নিয়ে জানতে আমার নিজ জেলা গাজীপুর থেকে ময়মনসিংহ পেরিয়ে জামালপুর হয়ে দুর্গম পথ পেরিয়ে গিয়েছিলাম মেরুরচর গ্রামে। পথে পথে নদী। নদীর উপর ব্রিজ। পাকা সড়কের পথ ধরে যেতে যেতে দেখা গেল সুজলা সুফলা স্নিগ্ধ চিরসবুজ অনেক গ্রাম। গ্রামের পর গ্রাম পেরুলেও সবুজ ফুরালো না। বকশীগঞ্জের দড়িপাড়া দৃষ্টিনন্দন মায়াবী গ্রামে রাত্রিযাপন শেষে পরদিন সকালে ব্যাটারি চালিত অটো রিকশায় যাত্রা শুরু হল মেরুর চরের দিকে। খাইরুন সুন্দরীর গ্রামের যাচ্ছি এই কথা ভাবতেই মনে একটি অজানা শিহরণ ছিল, আনন্দ ছিল, আকাঙ্খা ছিল অনেক কিছু জানার। যাবার পথে মেরুরচর ও আশেপাশের এলাকার নর-নারী পরিশ্রমী অনেকেই কাজ করছেন পথে মাঠে ঘাটে। ব্রহ্মপুত্র ও দশানি নদীর ব্রীজ পাড়ি দিয়ে মাত্র ২০ টাকা ভাড়া দিয়ে চলে গেলাম মেরুরচর গ্রামে এলাকাবাসী অনেকের মুখাবয়বে দেখা গেল ক্লান্তিময় ছাপ। ব্যস্ততার ফাঁকে তারা বললেন সুখ দুঃখের কথা। নদী ঘেঁষা বৃহৎ সাদা হাসের খামার, উঠোনে ও জমিতে গবাদি পশু, বাড়ি বাড়ি সবজি গাছ। সব মিলিয়ে শান্ত এক গ্রাম মেরুর চর। জানা গেল ব্রহ্মপুত্রের বুক চিরে আসে বন্যার পানি। উপচে পড়া পানিতে প্লাবিত হয় মেরুর চরের ফসলি জমি। এ গ্রামে বন্যা আসা মানেই দুঃখ আসা। দুঃখকে জয় করে বুকে বড় আশা নিয়ে এই বন্যাকেই তারা মোকাবেলা করে। নদীর সাথে মিতালি করে মেরুর চরের মানুষ তাদের উৎপাদিত ফসল শস্য অন্য কোন গ্রামে নিয়ে বিক্রি করে। নদী কেন্দ্রিক হয়ে পড়ে তাদের জীবন যাপন। মেরুর চরের অনতিদূরে মাদারের চর বাজারে চলে তাদের নানান পণ্যের বেচাকেনা। চরের পথ ধরে গান গাইতে গাইতে তারা ফেরে বাড়ি। গ্রামে এসেছে বিদ্যুত, দেখা গেলো টিভি বিনোদন, যুবকদের মোবাইল আড্ডা । আরো দেখা গেলো নিম্ন আয়ের মানুষের হতাশার মুখ জানা গেলো বর্ষায় প্লাবনের পানি ঢুকে পড়ে গ্রামের আনাচে কানাচে, স্কুলের আঙিনায় যেখানে খায়রন সুন্দরী লেখাপড়া করতেন। তার বাবা মরহুম আজগর আলী মাস্টার ছিলেন ধনাঢ্য ।ধর্মীয় অনুশাসন মেনে সুনামের সাথে চলতেন এলাকায়। আজগর আলী মাস্টার ছিলেন স্থানীয় মেরুরচর হাছেন আলী উচ্চ বিদ্যালয় এর শিক্ষক।শিক্ষক কন্যা খাইরুন নাহার খুব সুন্দরী ছিলেন। মাথায় ছিলো লম্বা কালো কেশ। গ্রামের সবাই তাকে স্নেহ করতেন। এই গ্রামের মানুষ আজও খায়রুন সুন্দরী কে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে। দেওয়ানগঞ্জের বড়খালি এলাকার ধনাঢ্য আরেকটি পরিবারের সন্তান ফজল হকের সাথে তার বিয়ে হয় সামাজিক রীতিনীতি মেনে। মহা ধুমধামে বিয়ে সম্পন্ন হয়। তাদের মধ্যকার প্রেম ভালোবাসা সকলের কাছে হয়ে ওঠে উপজীব্য। ওই কাহিনী নিয়ে একসময় দুর গ্রামে হতো চটকদার যাত্রা পালা। দাম্পত্য জীবনে খাইরুন সুন্দরীর বড় ছেলে খাইরুল ইসলাম এখন পেশায় একজন ব্যারিস্টার । প্রেম কাহিনীর পথ ধরে গত ৬০ বছর পূর্বেকার ঘটনাকে যাত্রাপালা নাটকে সর্বশেষ খায়রন সুন্দরী সিনেমায় তথ্য বিকৃতি করে তৈরি করা হয়েছে রসালো কাহিনী।

যেখানে নেয়া হয়েছে মিথ্যার আশ্রয়। খাইরুন সুন্দরীর স্বাভাবিক মৃত্যু হলেও সিনেমায় দেখানো হয়েছে ফজলের হাতে নাকি যমুনার জলে খায়রুন সুন্দরীর মৃত্যু হয়েছে। এই মিথ্যাচার নিয়ে এলাকাবাসী ক্ষুব্ধতা প্রকাশ করেছন। খায়রুন সুন্দরী শৈশব কৈশোর পেরিয়ে তার ছোট ভাই রফিকুল ইসলাম সহ অনেকের সাথে স্মৃতির সময় কাটিয়েছে। সেই রফিকুল ইসলাম গত ১৩ বছর আগে না ফেরার দেশে চলে গেছে। রফিকুল ইসলামের স্ত্রী বয়োবৃদ্ধ হলেও তার মনে ছিল চিরসবুজতা। খাইরুন সুন্দরী একসময়ের টিনশেড বসতবাড়ি এখন কেবলই স্মৃতি যা ছুয়ে দেখে এসেছি। ঘরে প্রবেশ করে দেখে এসেছি। এ ছিলো যেন এক অপূর্ব ও দুর্লভ উপলব্ধি। খাইরুন সুন্দরী সিনেমায় উপস্থাপিত কল্পকাহিনী স্থানীয় মুরুব্বিরা ঘৃণা করে প্রত্যাখ্যান করেছেন। অশ্রু সজল হয়ে ক্ষুব্ধতা প্রকাশ করেছেন। খাইরুন সুন্দরীর পাঁচ ছেলের মধ্যে এক ছেলে চান মিয়া শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত। আরেকজন ইলেকট্রিশিয়ান। মেরুর চর ফেলে চলে আসার পথে ওই গ্রামের প্রতি একটি মায়া তৈরি হয়ে গেল। ওই এলাকার মানুষ এবং সুন্দর কাঠামোর স্কুলের প্রতি তৈরি হয়ে গেল অনবদ্য আকর্ষণ। প্রতিবেদন তৈরিতে সময় দান করেছেন মমতা খালা, ওই গ্রামের যুবক আতিক, অটো বাইক চালক কামরুলসহ কজন শিক্ষার্থী। তাদের নিয়েও রয়ে গেল আমার খন্ড খন্ড স্মৃতি। লিখতে গিয়ে অনেক লেখা হলোনা। আসলো না কলমের ডগায়। এটাই বাস্তবতা যে, লেখনীর পাতায় অনেক কিছুই অসম্পূর্ণ রয়ে যায়। আবার চেষ্টা করবো লেখতে। মেরুরচর আছে খাইরুন সুন্দরী নেই খাইরুন সুন্দরী ও ফজলের প্রেম কাহিনী আছে, স্মৃতি আছে। মেরুর চরে নদীর বহতা আছে, মানুষের মধ্যে দুঃখ আছে, তৃপ্তির হাসি আছে। শুধু নেই খায়রুন সুন্দরী ও তার কবর। নেই তার মেয়ে। আসলে জীবনটাই বোধহয় এমন। গাজীপুরে ফিরে এসে ইচ্ছে করছে যেন আবারো চলে যাই মেরুর চরের টানে।