ক্রমেই জটিল হচ্ছে শিল্পনগরী গাজীপুরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। এরইমধ্যে নগরীর চৌরাস্তা, টঙ্গী ও জয়দেবপুরসহ ১৯ টি জায়গা অপরাধের হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করেছে পুলিশ। তার উপর নতুন আতঙ্ক, ধরা পরলেও দ্রুতই জামিনে বেড়িয়ে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে অপরাধীরা।
গেলো ২৭ মে গাজীপুরের কোনাবাড়িতে নাসির পালোয়ানকে কুপিয়ে জখম করে বেশ কয়েকজন। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় তার। এর পরের মাসেই মোবাইল চুরির অভিযোগে পিটিয়ে হত্যা করা হয় গার্মেন্টসকর্মী হৃদয়কে। সবশেষ সাংবাদিক তুহিন হত্যাকাণ্ডের ঘটনা যেনো সবকিছুরই সীমা ছাড়িয়েছে।
চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি গাজীপুরবাসীর নিত্যকার চিত্র। প্রশ্ন, তবে এই শহরের মানুষের আতঙ্ক আর ভয় থেকে মুক্তি মিলবে কবে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর জনগণ আর পুলিশের সম্পর্ক ফাটলের ফলাফল এই পরিস্থিতি। তার উপর পুলিশের জনবল ঘাটতি আর বেকারত্ব শ্রমিকরাও অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।
দেরিতে হলেও বিষয়গুলো আমলে নিয়েছে পুলিশের নীতিনির্ধারকরা। জনসাধারণের সাথে দূরত্ব ঘোচাতে গাজীপুরে এরই মধ্যে শুরু হয়েছে ওঠান বৈঠক আর ওপেন হাউজ ডের মতো কার্যক্রম। জেলাজুড়েই বাড়ানো হয়েছে রাত্রিকালীন টহলও।
মেট্রো এরিয়ার নিরাপত্তা নিশ্চিতে আরও এক হাজার পুলিশ সদস্য যোগ দেয়ার পাশাপাশি প্রতি রাতেই দায়িত্ব পালন করবেন ডিসি পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা।
গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, সম্প্রতি টহল সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। যেহেতু রাতে অপরাধের সংখ্যা বেশি হয় তাই তাৎক্ষনিকভাবে সিদ্ধান্ত দেয়ার জন্য প্রতি রাতেই ডিসি পদমর্যাদার একজন দায়িত্ব পালন করবে। জিএমপিতে বর্তমান পুলিশের সংখ্যা ১৭০০ আর জরুরিভাবে যোগদানের অপেক্ষায় রয়েছে আরও ১০০০। আমরা তাদের পেলে কাজের গতি আরও বৃদ্ধি পাবে।
গাজীপুর জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার খন্দকার আশফাকিজ্জামান বলেন, প্রতিদিন রাতে জেলায় টহল দিচ্ছে ৪৮ টি পুলিশের টিম। বিট পুলিশের অংশ হিসেবে উঠান বৈঠক আর ওপেন হাউজ ডের কার্যক্রম শুরু করেছে জেলা পুলিশ। বেশ সাড়াও পেয়েছি আমরা।
শুধুমাত্র টহল আর গ্রেফতার দেখিয়ে সমাজে স্থিতিশীলতা ফেরানোর এমন চেষ্টাতেও প্রশ্ন থেকে যায়। কেননা, গ্রেফতারের পর অপরাধীদের অনেকেই জামিনে মুক্তি পেয়ে পুনরায় জড়িয়ে পরছেন একই অপরাধে। এই যেমন মেট্রো এরিয়া থেকে গেলো ৭ মাসে প্রায় হাজারখানেক ছিনতাইকারীকে গ্রেফতারের কদিন পরই এক তৃতীয়াংশ চিন্হিত অপরাধী জামিনে বেড়িয়ে যায়। এমন বাস্তবতায় পুলিশের পেশাদারিত্বের পাশাপাশি আইনি জ্ঞানের অদক্ষতাকেও দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. জাকিরুল ইসলাম বলেন, ‘আসামিদের যখন পুলিশ কোর্টে প্রেরণ করেন তখন কাগজে অনেক তথ্য লিখেন না। ফরোয়ার্ডিং এর ডকুমেন্টস এ কি কি তথ্য লিখতে হয় কিংবা কিভাবে লিখতে হয় অনেকেই তা জানেন না। সেই ঘাটতি থেকেই আদালত থেকে সহজেই জামিন পেয়ে যায় তারা। পুলিশ সদস্যদের আইন সম্পর্কে আরও দক্ষতা অর্জন প্রয়োজন।’
সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) গাজীপুরের সহসভাপতি শেকানুল ইসলাম শাহী বলেন, আসামিরা জেল থেকে ছাড়া পেয়ে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। এই দায় পুলিশের পাশাপাশি সমাজেরও রয়েছে। কেননা, যখন একজন চিহ্নিত অপরাধী যখন জেল থেকে ছাড়া পায়ে আবারও একই অপরাধ করে তখন তাকে উচিত সামাজিকভাবে রুখে দেয়া। সেই ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলের নেতারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
অপরাধের হটস্পট হিসেবে এরইমধ্যে গাজীপুরের ১৯ টি জায়গা চিহ্নিত করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। যেগুলো হলো টঙ্গীর সান্দারপাড়া রাস্তার মাথা, হোন্ডা গলি, শহীদ আহসানউল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতালের পেছনে, মিলগেট, ন্যাশনাল টিউবস রোডের মাথা, সফিউদ্দিন রোডের মাথা, হোসেন মার্কেটের কাঠপট্টি, গাজীপুরা বাঁশপট্টি, তারগাছ, গাজীপুর চান্দনা চৌরাস্তা, টঙ্গী স্টেশন রোড, টঙ্গী ব্রিজ, টঙ্গী বাজার, জয়দেবপুর বাজার, লক্ষ্মীপুরা, কোনাবাড়ী, গাজীপুর নগরের বাসন, ভোগড়া বাইপাস ও গাজীপুর উড়ালসড়কের নিচের এলাকা।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলোর যৌথ উদ্যোগে এই জায়গাগুলো ২৪ ঘণ্টা নজরদারির পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।