দুঃসময়ে রাজপথে কারা ছিলেন? মামলা-হামলার বোঝা কারা কাঁধে নিয়েছিলেন? আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর অবস্থানের মধ্যেও কারা মিছিল-সমাবেশে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন? আর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেই ত্যাগীদের পাশে এখন কারা আছেন—এমন একাধিক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে বিএনপির তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে। বিএনপির কিছু অবহেলিত ও ত্যাগী নেতা-কর্মীর অভিযোগ, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দলটির নেতা-কর্মীদের ওপর মামলা, হামলা, গ্রেপ্তার ও হয়রানির কারণে যখন রাজনৈতিক মাঠ ছিল অত্যন্ত কঠিন, তখন অনেক কর্মী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাজপথে সক্রিয় ছিলেন। অনেকের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়েছে, অনেকে কারাবরণ করেছেন, কেউ কেউ আত্মগোপনে থাকতে বাধ্য হয়েছেন। আন্দোলন-সংগ্রামে অংশ নিতে গিয়ে অনেক পরিবার আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও তাদের দাবি। তাদের প্রশ্ন—সেই দুঃসময়ের কর্মীরা আজ কোথায়? তৃণমূলের ক্ষুব্ধ নেতা-কর্মীদের ভাষ্য, রাজনৈতিক দুঃসময়ে অনেক সিনিয়র নেতা মাঠে নিয়মিত সক্রিয় না থাকলেও কর্মীরা রাজপথ ছাড়েননি। পুলিশের বাধা, মামলা কিংবা হামলার আশঙ্কা—কোনো কিছুই তাদের দলীয় কর্মসূচি থেকে সরাতে পারেনি। অথচ সময় বদলানোর পর সাংগঠনিক মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সেই ত্যাগী কর্মীদের অনেকেই পিছিয়ে পড়ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। আরও গুরুতর অভিযোগ হলো—যারা অতীতে বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েছিলেন, তাদের মধ্যকার কেউ কেউ এখন পরিস্থিতির পরিবর্তনের পর বিএনপির ঘনিষ্ঠজন হিসেবে জায়গা করে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। তৃণমূলের অভিযোগ, অতীতের রাজনৈতিক ভূমিকা যথাযথভাবে যাচাই না করেই যদি নতুন করে রাজনৈতিক পরিচয় ও সাংগঠনিক প্রভাব তৈরি করার সুযোগ দেওয়া হয়, তাহলে দীর্ঘদিনের ত্যাগী কর্মীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য ও অতীত রাজনৈতিক ভূমিকা যাচাই ছাড়া কারও বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায় না। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য নেওয়া এবং দলীয়ভাবে যাচাই-বাছাই করা প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। দুঃসময়ে আমরা, সুসময়ে অন্যরা’—ক্ষোভ তৃণমূলে বিএনপির কয়েকজন ত্যাগী নেতা-কর্মী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দুঃসময়ে যারা দলের কর্মসূচিতে মাঠে ছিলেন না, সুসময়ে তাদের রাজনৈতিক গুরুত্ব যদি বাড়তে থাকে আর যারা মামলা-হামলা মাথায় নিয়ে রাজপথে ছিলেন তারা যদি উপেক্ষিত হন, তাহলে তৃণমূলের কর্মীদের মধ্যে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। তাদের বক্তব্য, রাজনীতি যদি কেবল ক্ষমতার সময়ের পরিচয় ও সুবিধার হিসাব হয়, তাহলে দুঃসময়ে দলের জন্য যারা সর্বস্ব ঝুঁকিতে ফেলেছিলেন তাদের ত্যাগের মূল্য কোথায়? তারা মনে করেন, দলের সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে শুধু বর্তমান অবস্থান নয়, দুঃসময়ে কে কোথায় ছিলেন, কে মাঠে ছিলেন, কে মামলা-হামলার শিকার হয়েছেন এবং কে দলের কর্মসূচিতে ধারাবাহিকভাবে সক্রিয় ছিলেন—এসব বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। পদ নয়, সম্মান চান ত্যাগীরা তৃণমূলের এসব নেতা-কর্মীর দাবি, তাদের বড় কোনো পদ-পদবির আকাঙ্ক্ষা নেই। তারা চান রাজনৈতিক পরিচয়ের মর্যাদা, সিনিয়র নেতাদের কাছ থেকে সম্মান এবং দলের ভেতরে ত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন। তাদের ভাষায়, “আমরা দুঃসময়ে দলের পাশে ছিলাম। তখন রাজপথে ভয় ছিল, মামলা ছিল, হামলার আশঙ্কা ছিল—তারপরও আমরা পিছিয়ে যাইনি। এখন আমাদের কোনো পদ-পদবি না দিলেও অন্তত ভুলে যাবেন না। যারা দলের জন্য কঠিন সময় পার করেছে, তাদের সম্মানটুকু দিন।তাদের আরও দাবি, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন করে যারা দলের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন বা ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করছেন, তাদের অতীত রাজনৈতিক ভূমিকা যাচাই করে দেখা হোক। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের তৃণমূল নেতা-কর্মীদের অভিযোগ শুনে সাংগঠনিকভাবে নিরপেক্ষ মূল্যায়নের ব্যবস্থা করা হোক। মাঠে ছিলাম, মাঠে আছি, মাঠেই থাকব’ ক্ষোভ থাকলেও দলের প্রতি আনুগত্যের জায়গা থেকে সরে যেতে চান না বলে জানিয়েছেন এসব নেতা-কর্মী। তাদের বক্তব্য, “আমরা পদ-পদবির জন্য রাজনীতি করিনি। দলের দুঃসময়ে রাজপথে ছিলাম, দলের সুসময়েও থাকব। আমাদের ক্ষোভ ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়; আমাদের প্রশ্ন অবমূল্যায়নের বিরুদ্ধে। আমরা বিএনপিকে ভালোবাসি, তাই মাঠে ছিলাম, মাঠে আছি এবং ইনশাআল্লাহ ভবিষ্যতেও মাঠে থাকব। তৃণমূলের মুখোমুখি প্রশ্ন দুঃসময়ে যারা মামলা-হামলা উপেক্ষা করে রাজপথে ছিলেন, সাংগঠনিক মূল্যায়নে তাদের ভূমিকা কতটা বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে? অতীতে বিএনপির বিরুদ্ধে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ছিলেন—এমন ব্যক্তিদের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণের আগে তাদের অতীত ভূমিকা যাচাই করা হচ্ছে কি? যেসব নেতা-কর্মী আন্দোলন-সংগ্রামে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, মামলা ও হয়রানির শিকার হয়েছেন, তাদের খোঁজ-খবর নেওয়ার কোনো কার্যকর উদ্যোগ আছে কি? দীর্ঘদিনের ত্যাগী কর্মীদের পাশ কাটিয়ে নতুন করে প্রভাবশালী হয়ে ওঠা ব্যক্তিদের বিষয়ে তৃণমূলের অভিযোগগুলো কি দলীয়ভাবে যাচাই করা হবে? রাজনৈতিক সুসময় এলে যদি সুবিধাভোগীরা সামনে চলে আসে আর দুঃসময়ের কর্মীরা আড়ালে পড়ে যান, তাহলে ভবিষ্যতে তৃণমূলের কর্মীদের মধ্যে এর কী প্রভাব পড়বে? দলের জন্য যারা বছরের পর বছর মাঠে ছিলেন, তাদের সম্মান ও সাংগঠনিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে নেতৃত্বের পক্ষ থেকে কী উদ্যোগ নেওয়া হবে?তৃণমূলের কর্মীরা পদ-পদবি নয়, যে সম্মান ও মূল্যায়ন দাবি করছেন—দলীয় নেতৃত্ব কি সেই প্রত্যাশাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখবে? সবশেষে তৃণমূলের বক্তব্য একটাই—রাজনীতি শুধু সুসময়ের পরিচয় নয়; দুঃসময়ে কে পাশে ছিল, সেটিও রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই ত্যাগীদের ভুলে নয়, তাদের ত্যাগের স্বীকৃতি দিয়েই দলকে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যাশা তাদের। তাদের প্রত্যয়—দুঃসময়ে রাজপথে ছিলাম, এখনো মাঠে আছি। দলের জন্য কোনো পদ-পদবির লোভ নেই। বিএনপিকে ভালোবাসি, তাই রাজপথে ছিলাম, আছি এবং ইনশাআল্লাহ ভবিষ্যতেও থাকব।