October 29, 2026, 12:40 pm
শিরোনাম:
গাজীপুর সদর হাসপাতালে ছারপোকা, দুর্গন্ধ ও লিফটের ভোগান্তি; উন্নত পরিবেশের দাবি উপাচার্যের সঙ্গে ক্লাব প্রতিনিধিবৃন্দের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত গাজীপুরে গ্রীন হাসপাতালে নবজাতকের বিশেষ পরিচর্যা ইউনিট উদ্বোধন বন ও পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের নতুন কমিটি গঠন, সভাপতি রাব্বি ও সাধারণ সম্পাদক হাফিজ উদ্দিন ডেঙ্গু প্রতিরোধে বিএনপির সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ, উদ্বোধন করেন রুহুল কবির রিজভী ভাওয়াল রাজদিঘীসহ গাজীপুরের সব খাস পুকুর উদ্ধারের দাবিতে সমাবেশ অনুষ্ঠিত টঙ্গীতে গ্যাস লিকেজে একই পরিবারের তিনজন দগ্ধ, সবার অবস্থা আশঙ্কাজনক জুরাইন ও হাতিরঝিলে পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে মৎস্যজীবী দল নেতৃবৃন্দ বৃহত্তর গাজীপুরে আধুনিক ডেন্টাল চিকিৎসাসেবার নতুন ঠিকানা ‘ডেন্টাল হ্যাভেন’ অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি, আধুনিক চিকিৎসাসেবা ও শিশুদের জন্য বিশেষ প্লেগ্রাউন্ড বনানীতে পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে জাতীয়তাবাদী মৎস্যজীবী দলের নেতারা

কাপাসিয়ায় জরাজীর্ণ টিনশেড ঘরেই দিতে হয় উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের চিকিৎসাসেবা

হাবিবুর রহমান গাজীপুর

টিনের চাল ফুটো হয়ে গেছে। সামান্য বৃষ্টি হলেই সেই ফুটো দিয়ে পানি পড়ে। এমন ঝুঁকিপূর্ণ টিনশেড ঘরেই চলছে নারী ও শিশুদের চিকিৎসাসেবা। ঝড় আসলে টিনশেড ঘরে অবস্থানকালে রোগী, চিকিৎসকসহ সবাই আতঙ্কে থাকেন। শুধু তাই নয়, হাসপাতালে নেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ।এই দুরবস্থা গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার টোক ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের। অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে শতবর্ষী এই উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের সরকারি স্বাস্থ্যসেবা। বঞ্চিত হচ্ছেন গ্রামগঞ্জের প্রান্তিক মানুষ। স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাতায়াতের সড়কটিও সরু ও ভাঙ্গাচোড়া। স্থানীয়রা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের চিকিৎসা কার্যক্রম। টোক ইউনিয়নের সাধারণ মানুষ ছাড়াও কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া এবং ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলা ও পাগলা থানার প্রায় ১০টি গ্রামের লোকজন এই উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করেন।আশপাশের নেই কোনো ক্লিনিক বা হাসপাতাল। তাই চিকিৎসাসেবা নিতে তাদের আসতে হয় টোক ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে। টিনের চালায় ফুটো থাকায় বৃষ্টিতে বাড়ে দুর্ভোগ। ফলে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসকসহ জনবল কম থাকায় রোগীদের সঠিকব সেবা নিশ্চিত হচ্ছে না।মঙ্গলবার (৮ জুলাই) দুপুর ১২ টায় সরেজমিনে টোক ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায় পুরোনো টিনশেড ঘরে ঝুঁকি নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে চিকিৎসা কার্যক্রম। ভবনের অভ্যন্তরে অস্থায়ী পার্টিশন দিয়ে চিকিৎসা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।টিনের চাল ও টিনের বেড়ায় মরিচা পড়ে লাল হয়ে গেছে। বৃষ্টির সময় টিনের ফুটো দিয়ে ঘরে পানি পড়ায় মূল্যবান ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম নষ্ট হচ্ছে। প্রয়োজনীয় আসবাবপত্রের অভাবে স্বাস্থ্যকর্মী ও রোগীদেরকে দুর্ভোগ মাথায় নিয়েই চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের তথ্যমতে, প্রতিটি কেন্দ্রে গর্ভবতী নারী, মা ও শিশু বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা এবং ওষুধ পাবেন।যৌনবাহিত রোগ, ইপিআই, এমআর সেবা ও পরিবার পরিককল্পনা বিষয়ক পরামর্শ প্রদান করা হয়। এজন্য স্বাস্থ্যকেন্দ্রে একজন উপসহকারী মেডিকেল অফিসার, একজন ফার্মাসিস্ট ও একজন পরিদর্শিকা এসব সেবা নিশ্চিত করবেন। তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। টোক ইউনিয়নের উলুসাড়া, গ্রামের বাসিন্দা আমজাদ হোসেন বলেন, এ ইউনিয়নের অধিকাংশ মানুষের পেশা কৃষি। উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে চিকিৎসকসহ জনবল সংকটের কারণে দীর্ঘদিন ধরে প্রকৃত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে তারা। স্বাস্থ্য কেন্দ্রের অনুমোদিত পাঁচটি পদের মধ্যে মেডিকেল অফিসার, মিডওয়াইফ, উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার, ফার্মাসিস্ট ও অফিস সহায়কের পদ থাকলেও বর্তমানে মাত্র দু’জন কর্মকর্তা কর্মরত রয়েছেন। রোগীদের পাশাপাশি কষ্টের কথা জানিয়েছেন চিকিৎসকেরাও। ছোট একটি কক্ষে বসে প্রতিদিন দু’জন কর্মকর্তা গড়ে শতাধিক রোগীকে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। গ্রামবাসীর দাবি নতুন ভবন নির্মাণ, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ, আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ এবং উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের সার্বিক পরিবেশ উন্নতি করা না হলে উত্তরাঞ্চলের হাজার হাজার নারী ও শিশুরা বড় স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়বে। ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার টাঙ্গাব ইউনিয়নের টাঙ্গাব গ্রাম থেকে দেড় বছরের কন্যাশিশু মার্জিয়াকে নিয়ে এসেছেন উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে। শিশুটির মা কাজী রত্না বলেন, গত দুইদিন ধরে থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। উপরের টিনের চালের ফুটো দিয়ে চুঁইয়ে চুঁইয়ে পানি পড়ে ঘরের মেঝে স্যাঁত স্যাঁতে হয়ে গেছে। শুনছি মাঝেমধ্যেই টিনের বেড়া দিয়েও ঘরে পানি ঢুকে। আগে এ স্বাস্থ্যকেন্দ্রের চিকিৎসা করাতে হবে। না হলে যারা সেবা দিচ্ছে তাদের যেমন কষ্ট হয় তেমনি সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষও বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে। ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার পাগলা থানার বারইহাটি গ্রামের বাসিন্দা জামাল উদ্দিন তাঁর অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে এসেছেন। তিনি বলেন, উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে বড় ডাক্তার নাই। এরপরও আমারারে আইতে অয়। কারণ, ১০ কিলোমিটার দূরের উপজেলা সদরে যাইতে অনেক টাকা খরচ হয়। যদি এই জায়গায় বড় ডাক্তার দিত, আমরার মতো গরিব মানুষ বড় ডাক্তার দেহাইতে পারত। ভালো চিকিৎসা পাইত। টোক ইউনিয়নের সালোয়াটেকি গ্রামের বাসিন্দা লাল মিয়া বলেন, সাধারণ রোগের চিকিৎসার জন্য এই উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রই ভরসা। এখানে চিকিৎসক না থাকায় সারাধর চিকিৎসাসেবার জন্য ২০ কিলো মিটার দূরের উপজেল সদরের হাসপাতালে যেতে হয়। অনেক সময় নারী রোগীদেরকে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, পূর্বে একাধিকবার ভবন নির্মাণের উদ্যোগের কথা শোনা গেলেও জমিসংক্রান্ত জটিলতার কারণে তা বাস্তবায়ন হয়নি। এই স্বাস্থ্য কেন্দ্রটি উত্তরাঞ্চলের মানুষের চিকিৎসা ভরসা। ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার টাঙ্গাব ইউনিয়নের ভরপুর গ্রামের বাসিন্দা আফরোজা বেগম বলেন, ১০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে টোক ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে আসি চিকিৎসা নিতে। স্বাস্থ্য কেন্দ্রের যে অবস্থা আমাদের আগে কেন্দ্রের চিকিৎসা করা জরুরী হয়ে পড়েছে। বৃষ্টির সময় অনেক রোগী একসাথে অবস্থান করাও কষ্ট হয়ে যায়। কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার বাহাদিয়া ইউনিয়নের মজিদপুর গ্রামের বাসিন্দা ছেলের বউকে নিয়ে উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে এসছেন। তিনি বলেন, আমাদের গ্রামের মানুষের জন্য স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুন ভবন নির্মাণ এবং প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ জরুরী হয়ে পড়েছে।কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার এগারসিন্দু ইউনিয়নের বাসিন্দা স্বপ্না আক্তার এবং মারিয়া বেগম বলেন, গর্ভবতী নারী, শিশু ও সাধারণ রোগীরা চিকিৎসা নিতে এসে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে চিকিৎসক সংকট, ওষুধের স্বল্পতা এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে অনেক রোগীই সঠিক চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। স্থানীয় পল্লী চিকিৎসক তাপস দাস বলেন, স্বাধীনতার পূর্বে প্রতিষ্ঠিত এই উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের কোনো উন্নয়ন হয়নি। পাশের উপজেলার দুই ইউনিয়নের বাসিন্দারাও এ স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে চিকিৎসা নিয়ে থাকে। সঠিক চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে নতুন ভবন নির্মাণ এবং জনবল নিয়োগ জরুরি হয়ে পড়েছে। টোক ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার আজহার উদ্দিন বলেন, প্রতিদিন শতাধিক নারী, শিশু ও সাধারণ রোগী চিকিৎসাসেবা নিতে আসেন। জনবল ও অবকাঠামোগত সংকটের কারণে ওইসব সেবা গ্রহীতাদেরকে তাদের কাঙ্খিত সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। টিনের চালের ফুটো দিয়ে চুঁইয়ে বৃষ্টির পানি পড়ে ওষুধ নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। কাপাসিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান জানান, শুধু রোগী ও তাঁদের স্বজনেরাই নন, চিকিৎসকেরাও আতঙ্কে থাকেন। উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের সমস্যার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। নতুন ভবন নির্মাণ ও জনবল নিয়োগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।গাজীপুরের সিভিল সার্জন মামুনুর রহমান বলেন, টোক ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের সমস্যার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, দ্রুত সময়ের মধ্যেই অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও জনবল সংকট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর গাজীপুর বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহফুজুর রহমান বলেন, টোক ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও নতুন ভবন নির্মাণের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।



ফেসবুকে আমরা