একটি মুহূর্ত, একটি বেপরোয়া বাস, আর তাতেই বদলে গেল একটি মানুষের পুরো জীবন। কলম হাতে সত্যের পক্ষে লড়াই করা একজন সাংবাদিক দৈনিক রুদ্র বাংলা পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক মতিউর রহমান, আজ হাসপাতালের বিছানায় নিঃশব্দে শুয়ে আছেন। চোখে তার বেঁচে থাকার আকুতি, মুখে চাপা কষ্ট, আর হৃদয়ে এক পাহাড়সম বেদনা। গত বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) ঢাকার মুগদা এলাকার বাসা থেকে তিনি বের হয়েছিলেন একটি জানাজায় শরিক হতে। বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শেষ বিদায়ের সেই শোকাবহ মুহূর্তে উপস্থিত থাকার জন্য। হয়তো ভাবতেও পারেননি এই যাত্রাই তার জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর যাত্রা হয়ে উঠবে।গুলিস্তান মোড়ে ফুটপাতের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি অপেক্ষা করছিলেন বাহনের। ঠিক তখনই চোখের পলক ফেলার আগেই উল্টো দিক থেকে ছুটে আসে মৃত্যু। উৎসব পরিবহন–এর একটি বাস (ঢাকা মেট্রো-ব ১৫-৬৬০৯) বেপরোয়া গতিতে তার বাম পায়ের ওপর দিয়ে উঠে যায়। মুহূর্তেই রক্তে ভিজে যায় রাজপথ, আর একজন মানুষ চিৎকার করে উঠলেও নিষ্ঠুর শহর থেমে থাকেনি।চারপাশের মানুষ ছুটে আসেন, কেউ চিৎকার করেন, কেউ চোখের পানি ধরে রাখতে পারেন না। উপস্থিত যাত্রী ও পথচারীরা তাকে চিনে ফেলেন, এ যে সাংবাদিক মতিউর রহমান! দ্রুত তাকে উদ্ধার করে নেওয়া হয় পঙ্গু হাসপাতালে। কিন্তু সেখানে অপেক্ষা করছিল আরও কঠিন সত্য তার বাম পা আর বাঁচানো যাবে না। জীবন বাঁচাতে হলে পা কেটে ফেলতেই হবে, চিকিৎসকদের এই নির্মম সিদ্ধান্ত যেন আকাশ ভেঙে পড়ার মতো আঘাত হয়ে আসে। শেষ পর্যন্ত গত ৪ জানুয়ারি টেকনিক্যাল মোড়, মিরপুর-১ এ অবস্থিত বিআইএইচএস জেনারেল হাসপাতালে সার্জারি বিভাগের তত্ত্বাবধানে ডা. আবু সাঈদ খানের নেতৃত্বে অস্ত্রোপচার করা হয়। হাঁটুর নিচ থেকে চিরতরে আলাদা হয়ে যায় তার বাম পা। একটি পা নয় হারিয়ে যায় তার স্বাভাবিক জীবন, তার চলার স্বাধীনতা। বর্তমানে কেবিন সিট নম্বর ৩০৭/১-এ নিবিড় পরিচর্যায় রয়েছেন তিনি। ব্যথায় কাতরাচ্ছেন, ঘুম আসে না, মাঝেমধ্যে চোখের কোণে জমে ওঠে নীরব অশ্রু। তবুও তিনি ভেঙে পড়েননি। এই অসম লড়াইয়ে টিকে থাকার শক্তি খুঁজছেন সৃষ্টিকর্তার কাছে। এই কলমযোদ্ধা এখন দেশবাসী, সহকর্মী সাংবাদিক, শুভানুধ্যায়ী ও মানবিক মানুষের কাছে একটাই আবেদন রেখেছেন দোয়া করুন। দোয়া করুন যেন তিনি এই অমানবিক যন্ত্রণাকে শক্তিতে রূপ দিতে পারেন, যেন আল্লাহ তাকে আবার নতুনভাবে দাঁড়ানোর সাহস দেন। এই দুর্ঘটনা শুধু একজন সাংবাদিকের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয় এটি আমাদের সবার জন্য এক কঠিন প্রশ্ন। বেপরোয়া বাস, দায়িত্বহীন চালক আর নীরব প্রশাসনের কাছে আর কত জীবন এভাবে বলি হবে? আর কত মায়ের বুক খালি হবে, আর কত মানুষ জীবিত থেকেও অঙ্গহারা হবে? আজ একটি পা হারিয়েছে মতিউর রহমান—কিন্তু তার কলম যেন হার না মানে, তার সত্যের পথে চলা যেন থেমে না যায়