গাজীপুর সদর উপজেলার ভাওয়ালগড় ইউনিয়নের মনিপুর গ্রামের এক সময়ের আওয়ামী সুবিধাভোগী আব্দুল মোমেন খান এখন নতুন পরিচয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ওলামা দলের যুগ্ম আহ্বায়ক। গত পনের বছর ধরে দলবদল, প্রভাব খাটানো, জমি দখল আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঘিরে অর্থ-পলিটিকসের নানা কৌশলে আলোচনায় এই মোমেন খান, মৃত সিরাজ উদ্দিনের ছেলে। রাজনীতির শুরুটা ছিল আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ বলয়ে। সাবেক প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট রহমত আলী ও তাঁর ছেলে জেলা আওয়ামী নেতা জামিল হাসান দুর্জয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন তিনি। পরে গাজীপুর-৩ আসনের সাবেক সাংসদ মুহাম্মদ ইকবাল হোসেন সবুজের সঙ্গেও সম্পর্ক গড়ে ওঠে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সবুজ মনোনয়ন না পেলে মোমেন দলবদল করে আওয়ামী মনোনীত প্রার্থী অধ্যাপক রোমানা আলী টুসির পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। মনিপুরে মোমেনের প্রতিষ্ঠিত সিরাজ উদ্দিন খান স্কুল অ্যান্ড কলেজ তাঁর ক্ষমতার মূল কেন্দ্র। দীর্ঘদিন এই প্রতিষ্ঠানের সভাপতি ছিলেন তাঁর বোনজামাই লিটন মিয়া ওরফে টুকাই লিটন যিনি ভাওয়ালগড় ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, টুকাই লিটন কোটি টাকার দালালিতে জড়িয়ে পড়েন এবং পরে পলাতক হন। এরপর সভাপতির পদে বসানো হয় শেখ এমদাদুল হককে, যিনি আওয়ামী রাজনীতিরই আরেক পরিচিত মুখ এবং মোমেনের ঘনিষ্ঠ। স্থানীয়রা জানান, আওয়ামী রাজনীতির ছায়ায় মোমেন এতটাই প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন যে উপজেলা ও ইউনিয়নের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী তাঁর কাছে অনুগত হয়ে পড়েন। এমনকি তৎকালীন উপজেলা আওয়ামী সভাপতি মোশাররফ হোসেন দুলাল ও সাবেক ইউনিয়ন সাধারণ সম্পাদক
শফিকুল ইসলাম শফির সঙ্গেও তাঁর ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। সরেজমিনে জানা যায়, মোমেন খান তাঁর স্কুল–কলেজের সঙ্গে বাংলাদেশ বন বিভাগের প্রায় দেড় বিঘা জমি জবরদখল করেন। ওই জমিটি মনিপুর ও কাতলামরা এলাকার ইটের সলিং রোড লাগোয়া, যেখানে আগে আকাশমণি ও শালগাছের বাগান ছিল। সেগুলো কেটে ফেলে স্কুলের জন্য জায়গা বাড়ান। স্থানীয় সূত্র বলছে, বনবিভাগের কিছু কর্মকর্তা ঘুষের বিনিময়ে এ বিষয়ে চুপ ছিলেন। জমিটির বাজারমূল্য এখন প্রায় তিন কোটি টাকা। একজন উপজেলা ওলামা দলের নেতা বলেন, ‘বনভূমি দখল, ঘুষের খেলা-সবই করেছেন আওয়ামী প্রভাব ব্যবহার করে। তখন তাঁকে কেউ কিছু বলতে পারত না’।৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর মোমেন খান দ্রুত দিক পরিবর্তন করেন। প্রথমে যোগাযোগ
করেন জামায়াতে ইসলামীর সম্ভাব্য প্রার্থী ড. জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে। ৬ অক্টোবর ২০২৪ তিনি জামায়াতের সদস্য ফরমও পূরণ করেন। ড. জাহাঙ্গীরের সঙ্গে কয়েকটি মিছিলেও দেখা যায় তাঁকে।তবে কয়েক মাসের মধ্যেই নতুন পরিচয়ে হাজির হন-এইবার জাতীয়তাবাদী ওলামা দলে। নানা চাতুর্যে ১২ আগস্ট ২০২৫ তাঁর নাম ঘোষিত হয় ভাওয়ালগড় ইউনিয়ন
ওলামা দলের যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে। বিষয়টি ঘিরে দলে ক্ষোভ দেখা দেয়। জেলা ওলামা দলের এক নেতা বলেন, ‘একজন আওয়ামী সুবিধাভোগীকে এনে পদ দেওয়া ত্যাগী নেতাদের প্রতি অপমান’। উপজেলা কমিটির এক সদস্য অভিযোগ করেন, ‘এই পদ পেতে মোমেন আহ্বায়ক মাওলানা আমিনুল ইসলামকে এক লাখ টাকা ঘুষ দিয়েছেন’। বর্তমানে বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন অ্যাসোসিয়েশনের গাজীপুর সদর শাখার সেক্রেটারি পদও মোমেনের নিয়ন্ত্রণে। স্থানীয় শিক্ষা কর্মকর্তাদের সঙ্গে আঁতাত করে সেখানে প্রভাব বিস্তার করেছেন তিনি। পাশাপাশি মনিপুর বাজারে তাঁর মালিকানাধীন ‘সাথী লাইব্রেরি’ ও ‘মনিপুর জনকল্যাণ সমবায় সমিতি’ নামের প্রতিষ্ঠান দুটি এখন তাঁর আর্থিক দাপটের উৎস। একজন স্থানীয় বিএনপি নেতা বলেন, ‘মোমেন এখন বিএনপি নাম ব্যবহার করছেন, কিন্তু ভেতরে ভেতরে এখনো আওয়ামী ছায়াতেই ঢাকা। সুযোগ পেলেই আবার রঙ বদলাবেন-এটা সবাই জানে’। এ বিষয়ে জেলা জাতীয়তাবাদী ওলামা দলের আহ্বায়ক হাফেজ ইব্রাহিম বলেন, ‘দলের মধ্যে এমন ব্যক্তিদের অনুপ্রবেশ ক্ষতিকর। বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখছি’। সদর উপজেলা ওলামা দলের আহ্বায়ক মাওলানা আমিনুল ইসলাম (কাজী) বলেন, ‘মোমেন খান আমাদের ইউনিয়ন শাখার একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি। তাঁর বিরুদ্ধে যদি কেউ লিখিত অভিযোগ দেন, দল তা যাচাই করবে’। সদর উপজেলা জাতীয়তাবাদী ওলামা দলের সদস্য সচিব মো. বিপ্লব হোসেন বলেন, ‘দলে যাঁরা নতুন যুক্ত হচ্ছেন, তাঁদের অতীত রাজনীতি যাচাই করা হচ্ছে। কেউ অপ্রীতিকর কিছু করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে’।যোগাযোগ করা হলে মোমেন খান অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আমি কোনো বেআইনি কাজ করিনি। আমাকে রাজনৈতিকভাবে হেয় করার জন্য এসব বলা হচ্ছে’। রাজনীতি তাঁর কাছে নীতির নয়, বরং লাভের হিসাব। একসময় আওয়ামী ফ্যাসিস্টদের ঘনিষ্ঠ, পরে জামায়াত, এখন বিএনপি ওলামা দলে-এমন রঙ বদলের গল্পে গাজীপুর জুড়ে চলছে নানা কানাঘুষা। প্রশ্ন উঠেছে-দল বদলে বদলে ‘পল্টিবাজ’ মোমেন কি কেবল এক ব্যক্তির চালাক চরিত্র, নাকি এ আমাদের সামগ্রিক রাজনীতির নির্লজ্জ প্রতিচ্ছবি ?